জাপানে জুমিনজেই ও কোকুমিন নেনকিন: স্টুডেন্টদের জন্য ¥২০,০০০ ছাড় ও হঠাৎ বিলের ফাঁদ

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। কোনো এক শহরের কনবিনির রেজিস্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। শিফট প্রায় শেষ। ম্যানেজার একটা সাদা খাম এগিয়ে দিলেন: "এটা তোমার মেইলবক্সে এসেছিল, ভুল করে আমাদের কাছে চলে এসেছে।" খামের ওপর লেখা 日本年金機構। বুকটা ধক করে ওঠে। ভিতরে কী আছে? আজকের গল্প এই খামটা নিয়েই।
সকাল: সিটি অফিসের কাউন্টারে প্রথম শিখে নেওয়া কথা
আপনি জাপানে নামার পর ১৪ দিনের মধ্যে ওয়ার্ড বা সিটি অফিসে ঠিকানা রেজিস্টার করেছিলেন। ওই কাউন্টারেই আপনার নাম জুমিনহyo-তে উঠেছে, আর সেখান থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুটো সিস্টেমে ঢুকে গেছেন: স্বাস্থ্যবিমা (কোকুমিন কেনকো হোকেন) এবং জাতীয় পেনশন (কোকুমিন নেনকিন)। জাপানে ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী যে কেউ থাকলে, বিদেশি স্টুডেন্টসহ, পেনশনের আওতায় পড়েন। হ্যাঁ, আপনিও।
অনেক বাংলাদেশি স্টুডেন্ট এটা জানে না। কাউকে দোষ দিচ্ছি না। বিমানবন্দরে কেউ এটা বলে না।
দুপুর: ক্লাসের ফাঁকে হিসাব, ¥২০,০০০ আসলে কী
জাতীয় পেনশনের মাসিক প্রিমিয়াম মোটামুটি ¥১৭,০০০-এর কাছাকাছি (প্রতি বছর বদলায়, তাই নিশ্চিত হয়ে নিন)। বছরে হিসাব করলে প্রায় ¥২ লাখের বেশি। একজন ভাষাস্কুলের স্টুডেন্ট যিনি মাসে ¥৯০,০০০–১,০০,০০০ আয় করেন, তার জন্য এটা বিশাল চাপ।
এখানে কাজে আসে গাকুসেই নোফু টোকুরেই (学生納付特例)। এটা পেনশন ছাড় নয় যে টাকা মাফ হয়ে যায়; এটা পেছানোর সুবিধা। শর্ত মোটামুটি এরকম: আপনি স্বীকৃত স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট এবং আপনার আগের বছরের আয় একটা সীমার নিচে। সীমাটা প্রায় ¥১৩ লাখের কাছাকাছি, তবে পরিবর্তন হতে পারে, তাই সিটি অফিসে জিজ্ঞেস করুন। অনুমোদন পেলে ওই সময়ের প্রিমিয়াম দিতে হয় না, আর পরে ১০ বছরের মধ্যে চাইলে সেটা পরিশোধ করা যায়।
কিন্তু একটা সতর্কতা: ছাড়ের সময়টা আপনার ভবিষ্যৎ পেনশন পরিমাণে গোনা হয় না, যদি না পরে পরিশোধ করেন। আর ভাষাস্কুল সব সময় এই সুবিধার আওতায় পড়ে না। অনেক সময় ভাষাস্কুলের স্টুডেন্টরা যোগ্য হন, তবে এটা স্কুলের ধরন ও সিটির নিয়মের ওপর নির্ভর করে। আগে জেনে নিন। ভাষাস্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য নিয়ে আমাদের এই গাইডটা দেখতে পারেন।
বিকেল: জুমিনজেই, যে বিল আসে দ্বিতীয় বছরে
জুমিনজেই (住民税) হলো স্থানীয় কর। এর মজা (বা ফাঁদ) হলো, এটা আগের বছরের আয়ের ওপর হিসাব হয়। অর্থাৎ প্রথম বছর আপনি কিছুই পান না, দ্বিতীয় বছর জুন মাসের দিকে হঠাৎ একটা নোটিশ ঢোকে। যদি আগের বছর পার্টটাইমে বছরে প্রায় ¥১ লাখ ৫ হাজার–এর বেশি আয় করে থাকেন (সীমা শহরভেদে একটু আলাদা), বিল আসার সম্ভাবনা আছে। সংখ্যাটা কয়েক হাজার ইয়েন থেকে ¥৫০,০০০ বা তারও বেশি হতে পারে।
সমস্যা হয় যখন স্টুডেন্ট দেশে ফিরে যায় বা স্কুল বদলায় আর ঠিকানা আপডেট করে না। বিল পুরোনো ঠিকানায় যায়, দেরির জরিমানা জমে। আমি এমন কেসও দেখেছি যেখানে ভিসা এক্সটেনশনের সময় বকেয়া কর ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সন্ধ্যা: পার্টটাইম থেকে কাটা টাকা আর জাপান স্টুডেন্ট ট্যাক্স রিটার্ন
আপনার পে-স্লিপে একটা লাইন দেখবেন: 源泉徴収, মানে উৎসে কর কাটা। স্টুডেন্ট ভিসায় সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করা যায়। আয় কম হলে কাটা টাকার অনেকটাই ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে। বছর শেষে কোম্পানি যদি নেনমাত্সু চোসেই না করে, তাহলে মার্চের মধ্যে নিজে কাকুতেই শিনকোকু (ট্যাক্স রিটার্ন) দিয়ে ফেরত দাবি করতে পারেন। কর অফিসে গেলে স্টাফরা সাধারণত সাহায্য করেন। সব ডকুমেন্ট (পে-স্লিপ বা গেনসেন চোসুহিয়ো) আগে থেকে রেখে দিন।
রাত: খামটা খুললে যা দেখবেন
খামে সম্ভবত পেনশনের পেমেন্ট স্লিপ বা ছাড়ের আবেদনের ফর্ম। ভয় পাবেন না। পরদিন ক্লাসের পর সিটি অফিসের নেনকিন কাউন্টারে যান। সঙ্গে নিন: রেসিডেন্স কার্ড, পাসপোর্ট, স্টুডেন্ট আইডি বা এনরোলমেন্ট সার্টিফিকেট। আবেদন প্রতি বছর নতুন করে দিতে হয়, এটা অনেকেই ভুলে যায়।
আর দেশে ফিরে গেলে? অন্তত ছয় মাস পেনশন দিয়ে থাকলে পেনশন লাম্প-সাম উইথড্রয়াল (脱退一時金) চাওয়া যায়। জাপান ছাড়ার পর ২ বছরের মধ্যে আবেদন করতে হয়। বাংলাদেশে বসেই করা যায়, তবে অর্থের পরিমাণ আপনার প্রদত্ত মাসের ওপর নির্ভর করে, আর এখানেও ছাড়ের মাসগুলো গোনা হয় না। আবেদনের আগে হিসাব করে নিন। নিয়ম বদলাতে পারে।
এই খরচ কি তবু জাপানকে লাভজনক রাখে?
অবশ্যই, যদি পরিকল্পনা থাকে। জাপানে পড়াশোনা মানে ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অনেক কম টিউশন, আর study abroad without IELTS-এর মতো অপশনও আছে; ভাষাস্কুল দিয়ে শুরু করা যায়। আপনি যদি higher study abroad after HSC ভাবছেন, তাহলে HSC-এর পর জাপান গাইডটা পড়ুন। বৃত্তির সুযোগ আছে এখানে। আর study abroad from Bangladesh-এর হিসাবে জাপানের কর-পেনশন একটা ছোট কিন্তু বাস্তব খরচ, আগে থেকে জানলে সামলানো সহজ। ভিসা পরিবর্তনের পথ বুঝতে ভিসার তুলনা দেখুন।
আজ রাতের তিনটি কাজ
- খামটা ফেলে রাখবেন না, তারিখ দেখে নিন।
- পে-স্লিপ আর গেনসেন চোসুহিয়ো ফাইলে রাখুন।
- ঠিকানা বদলালে বা দেশে ফিরলে সিটি অফিসে জানান।
আমি Inochi Global Education Institute-এর বরিশাল (নবগ্রাম রোড, মুসলিম পাড়া) অফিসে স্টুডেন্টদের কাউন্সেলিং করি; আপনার ঠিকানা বা প্ল্যান নিয়ে প্রশ্ন থাকলে আমাদের বরিশাল অফিসে কথা বলতে পারেন। জাপানে যাওয়ার পুরো প্রস্তুতিতে সাহায্যের জন্য জাপানে পড়াশোনার সেবা পেজটি দেখতে পারেন।
মন্তব্য
…