COE ফর্ম পূরণ: জাপান স্টুডেন্ট ভিসার লাইন বাই লাইন গাইড

গত বছর আগস্টে উত্তর বাড্ডার অফিসে এক ছেলে এসেছিল — হাতে একটা লাল কলম আর হাতে লেখা খাতার দুই পৃষ্ঠা। বলল, "স্যার, ফর্মটা তো পূরণ করেছি, শুধু আপনার সাইন লাগবে।" আমি তাকিয়ে দেখি — নামের বানান পাসপোর্টের সাথে মিলছে না, ঠিকানায় গ্রামের নাম লিখেছে কিন্তু ডাকঘর বাদ, আর জন্মতারিখে জাপানি ফরম্যাটের বদলে আমাদের ১২/০৮/২০০৪ লিখেছে। ওই একটি ফর্মের কারণে ওর ইনটেক ছয় সপ্তাহ পিছিয়ে গিয়েছিল।
তাই আজ আমি পুরো COE ফর্মটা লাইন ধরে ধরে দেখাব। COE মানে Certificate of Eligibility — এটা ভিসা নয়, বরং জাপানের ইমিগ্রেশন আপনার স্কুলকে যে ছাড়পত্র দেয়, সেই কাগজ। এই কাগজ হাতে পেলে দূতাবাসে গিয়ে ভিসা স্ট্যাম্প নিতে হয়।
শুরুর আগে: কোন ফর্ম, কে পূরণ করে
বাংলাদেশ থেকে আবেদন করলে সাধারণত দুটো ফর্ম একসাথে আসে — Application for Certificate of Eligibility এবং স্কুলের নিজের 入学願書 (Admission Application)। দুটোই প্রায় একই তথ্য চায়, তাই আগে সব তথ্য একটা কাগজে লিখে রাখুন।
মনে রাখবেন, COE ফর্ম ইংরেজি বা জাপানি দুই ভাষাতেই পূরণ করা যায়, কিন্তু জাপানি ভাষায় লিখলে ইমিগ্রেশন অফিসার দ্রুত পড়তে পারেন। আর জাপানি ভাষা না জানলে ঘাবড়াবেন না — HSC-র পর বিদেশে পড়াশোনার কথা ভাবলে জাপান এমন একটা দেশ যেখানে IELTS ছাড়া বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ আছে, শুধু JLPT N5 বা সমমানের প্রস্তুতি লাগবে।
- ফর্মে যা লিখবেন, তার প্রমাণপত্র অবশ্যই হাতে থাকতে হবে — পাসপোর্ট, NID, মার্কশিট।
- সব বড় হাতের ইংরেজি অক্ষরে লিখুন, নীল বা কালো বলপেনে।
- ভুল হলে সাদা কাগজে আবার লিখুন — সাদা টিপ দিয়ে কাটাকাটি করলে ফর্ম বাতিল হতে পারে।
লাইন বাই লাইন: প্রথম পৃষ্ঠা
১. Nationality / 国籍
এখানে লিখবেন Bangladesh বা バングラデシュ। "Bangladeshi" নয়, "Bangladesh" — এটা আমার দেখা সবচেয়ে সাধারণ ভুল।
২. Date of birth / 生年月日
জাপানি ফরম্যাটে লিখুন: বছর আগে, তারপর মাস, তারপর দিন। যেমন ২০০৪ সালের ৮ আগস্ট হলে 2004 / 08 / 08। পাসপোর্টের তারিখের সাথে হুবহু মিলতে হবে।
৩. Sex / 性別
M অথবা F — শুধু একটা অক্ষর।
৪. Name / 氏名
পাসপোর্টের ঠিক যেভাবে আছে সেভাবেই। উপনাম আগে, নাম পরে — যেমন RAHMAN, MD SAKIB। কোনো ডাকনাম নয়, কোনো বাড়তি স্পেস নয়।
৫. Address in your country / 本国の住所
এটা বাংলাদেশের ঠিকানা। বাসা বা রোড নম্বর, এলাকা, থানা, জেলা, পোস্টকোড — সব লিখুন। আমার পরামর্শ: ঠিকানা সবসময় আপনার NID-র সাথে মিলিয়ে লিখুন, কারণ ইমিগ্রেশন কখনো কখনো যাচাই করে।
৬. Occupation / 職業
ছাত্র/ছাত্রী হলে Student বা 学生। অগ্রিম কিছু লিখবেন না।
লাইন বাই লাইন: স্কুল আর কোর্স অংশ
এখান থেকে প্রশ্নগুলো আপনার স্কুল সম্পর্কে। আপনি স্কুল বেছে নেওয়ার আগেই এই অংশটা চোখ বুলিয়ে নিন — এতে বুঝবেন কোন স্কুল কী তথ্য চায়।
- Name of school: স্কুলের অফিসিয়াল নাম, জাপানি নামসহ। যেমন Tokyo Central Japanese Language School।
- Course name ও duration: যেমন "College Preparatory Course, 2 years"।
- Proposed date of entry: সাধারণত এপ্রিল বা অক্টোবর ইনটেক।
- JLPT level: আপনার সর্বশেষ পাস করা লেভেল। N5 পাস করেননি? খালি রাখবেন না — "Studying, N5 expected July" লিখুন।
৭. Guarantor / 身元保証人
সাধারণত স্কুলের প্রিন্সিপাল এই ঘরে সাইন করেন, আপনার দায়িত্ব নয়। কিন্তু নিচের অংশটা আপনার — financial sponsor, মানে কে টাকা দেবে।
৮. Sponsor-এর তথ্য
বাবা বা মা — যার ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিচ্ছেন। নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, ফোন সব লিখুন। সম্পর্ক লিখবেন Father বা Mother।
৯. Sponsor-এর আয় ও সঞ্চয়
এখানে সংখ্যাটা ব্যাংক সার্টিফিকেটের সাথে মিলতে হবে। ২০২৫ সালের হিসাবে, ভাষা স্কুলের জন্য সাধারণত ১৮-২০ লাখ ইয়েন দেখাতে হয় — টাকায় প্রায় ১৪-১৬ লাখ (এক্সচেঞ্জ রেট বদলায়, তাই সর্বশেষ রেট নিজে যাচাই করুন)।
একটা কথা মনে রাখবেন: আয় আর সঞ্চয় আলাদা ঘর। অনেকে আয়ের ঘরে সঞ্চয়ের টাকা লিখে ফেলেন, আর ইমিগ্রেশন তখন ব্যাংক কাগজের সাথে মেলাতে গিয়ে প্রশ্ন তোলে।
যে ভুলগুলোতে সবচেয়ে বেশি ফর্ম ফেরত আসে
আমি প্রতি ইনটেকে ৪০-৫০টা ফর্ম দেখি। নিচের ভুলগুলো প্রায় প্রতি মাসেই চোখে পড়ে:
- পাসপোর্টের নামের সাথে ফর্মের নামের বানান আলাদা — Hussain বনাম Hossain।
- জন্মতারিখের ফরম্যাট উল্টো — দিন আগে লিখে ফেলা।
- ঠিকানায় পোস্টকোড না দেওয়া।
- সাইন আর তারিখ না দিয়ে ফর্ম পাঠিয়ে দেওয়া — জাপানে তারিখ ছাড়া কাগজ অসম্পূর্ণ।
- পুরনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিয়ে দেওয়া — সাধারণত শেষ ৩-৬ মাসের স্টেটমেন্ট চাওয়া হয়।
আর একটা জিনিস — কম খরচে বিদেশে পড়াশোনার খোঁজে অনেকে কম ফির স্কুল বেছে নেন, তারপর ফর্মে জমা টাকার উৎস পরিষ্কারভাবে লিখতে পারেন না। টাকা কোথা থেকে এলো — জমি বিক্রি, ব্যবসার আয়, বাবার সঞ্চয় — ফর্মে এক লাইনে হলেও লিখুন।
এই সপ্তাহে যা করতে পারেন
ফর্ম নিয়ে বসার আগে তিনটা কাজ শেষ করুন। প্রথমে পাসপোর্ট আর NID-র ফটোকপি পাশে রাখুন। তারপর স্কুল থেকে ফর্মটার সর্বশেষ ভার্সন ডাউনলোড করুন — ফর্ম বছরে বদলায়। আর শেষে আপনার ব্যাংক থেকে সার্টিফিকেট আর স্টেটমেন্ট নিয়ে আসুন। এই তিনটা হাতে থাকলে ফর্ম পূরণে এক ঘণ্টার বেশি লাগবে না।
স্কুল আর কোর্স বাছাইয়ের পুরো ছবিটা দেখতে চাইলে COE গাইড আর ভিসার ডকুমেন্ট চেকলিস্ট পড়ে নিন। জাপানি ভাষা আগে থেকে শেখা শুরু করতে চাইলে JLPT গাইড কাজে দেবে।
আমি ইনোছি গ্লোবাল এডুকেশন ইনস্টিটিউটের উত্তর বাড্ডা, ঢাকা অফিসে (প্রগতি সরণি — জাপান দূতাবাস থেকে ১৩ মিনিট) শিক্ষার্থীদের কাউন্সেল করি। আপনার COE ফর্মটা পূরণ হয়ে গেলে একবার নিয়ে আসুন — আমি লাইন ধরে ধরে মিলিয়ে দেব, সাইন করার আগেই। আমাদের ঢাকা অফিসের ঠিকানা এখানে, আর জাপানে পড়ার পুরো প্ল্যান নিয়ে কথা বলতে চাইলে আমাদের জাপান স্টাডি সার্ভিস পেজে চোখ রাখুন।
মন্তব্য
…