জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পার্ট-টাইম কাজ: কোন্সবিনি, ইজাকায়া নাকি ফ্যাক্টরি?

তুমি যখন প্রথম টোকিওর কোনো ছোট স্টেশনে নামবে—হাতে বড় ব্যাগ, পকেটে মাত্র কয়েকদিনের খাবার—তখন মনে হবে, সবকিছু এত দ্রুত চলছে কেন? কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে তুমি দেখবে, তোমার পাশের ক্লাসমেট রাত ১০টায় কোন্সবিনির কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছে, আরেকজন শুক্রবার সন্ধ্যায় ইজাকায়ায় টেবিল মুছছে। জাপানে পড়াশোনার একটা বড় সুবিধা হলো—পার্ট-টাইম কাজ (যাকে এখানে বলে আরুবাইতো) করে নিজের খরচ চালানোর সুযোগ। আজ আমি সত্যি সত্যি বলব কোন কাজে কত টাকা, কত সময় লাগে, আর কীভাবে আবেদন করবে।
কোন্সবিনি: নতুনদের জন্য সবচেয়ে সহজ শুরু
সেভেন-ইলেভেন, লসন, ফ্যামিলিমার্ট—এই দোকানগুলো প্রায় প্রতি মোড়ে। আমি যখন ওসাকার নিশিনারিতে থাকতাম, আমার প্রথম কাজ ছিল একটা লসনে। কোন্সবিনির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এরা নতুনদের ট্রেনিং দেয়, জাপানি ভাষা খুব ভালো না হলেও চলে (JLPT N4 বা N3 থাকলে ভালো)। কাজের ধরন—কাউন্টারে বিল করা, শেলফ সাজানো, ময়লা পরিষ্কার।
- বেতন: টোকিওতে ঘণ্টায় ১,১০০–১,৩০০ ইয়েন (২০২৫ সালের হিসাব, এলাকাভেদে কমবেশি হতে পারে)। রাত ১০টার পর রাতের শিফটে ২৫% বেশি।
- সময়: ৪–৮ ঘণ্টার শিফট, সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার মধ্যে (ভিসার শর্ত)।
- আবেদন: দোকানে সরাসরি গিয়ে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করা, অথবা ‘টাউন ওয়ার্ক’ বা ‘বাইটো’ অ্যাপে খোঁজা।
তবে সাবধান—কোন্সবিনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, আর কিছু দোকানে জাপানি ভাষায় দ্রুত কথা বলতে হয়। শুরুতে ভুল হবে, এটা স্বাভাবিক।
ইজাকায়া: টিপস বেশি, কিন্তু ভাষা লাগবে
ইজাকায়া মানে জাপানি পানশালা। এখানে কাজ করলে জাপানি ভাষা খুব দ্রুত শেখা যায়, কারণ প্রতিদিন নতুন মানুষের সাথে কথা বলতে হয়। আমার এক ছাত্র সাইতামার ওমিয়া স্টেশনের পাশে একটা ইজাকায়ায় কাজ করত—সে বলত, ‘স্যার, এখানে তিন মাসে আমার N3 লেভেলের কথা বলার সাহস এসেছে।’
- বেতন: সাধারণত ঘণ্টায় ১,২০০–১,৫০০ ইয়েন, টিপস (যাকে বলে ‘বাইতো’) আলাদা।
- সময়: সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা—তাই ক্লাসের সাথে মিলিয়ে নিতে হয়।
- আবেদন: প্রায়ই ‘বাইটো’ ম্যাগাজিন বা ‘タウンワーク’ (Town Work) এ বিজ্ঞাপন থাকে। ইন্টারভিউতে জাপানি ভাষায় কিছু প্রশ্ন আসে—যেমন ‘কেন ইজাকায়ায় কাজ করতে চাও?’
একটা ট্রেড-অফ আছে: রাত দেরি পর্যন্ত কাজ করলে পরদিন সকালের ক্লাসে ঘুম আসবে। আমি সবসময় বলি, প্রথম সেমিস্টারে ইজাকায়া না নেওয়াই ভালো।
ফ্যাক্টরি: টাকা বেশি, কিন্তু সময় কম
গুনমা, সাইতামা বা আইচি প্রিফেকচারের ফ্যাক্টরিতে অনেক বাংলাদেশি কাজ করেন। সাধারণত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, অটো পার্টস অ্যাসেম্বলি বা প্যাকেজিং। এখানে বেতন সবচেয়ে বেশি—ঘণ্টায় ১,৩০০–১,৬০০ ইয়েন, আর ওভারটাইম পেলে ২,০০০ ইয়েনের উপরে। কিন্তু সমস্যা হলো যাতায়াত। টোকিও থেকে গুনমা যেতে ঘণ্টা দুই লাগে।
একটা বাস্তব ঘটনা বলি। আমার এক ছাত্রী, নাম বলব না, টোকিওর নেরিমা ওয়ার্ডে থাকত। সে সপ্তাহে তিনদিন গুনমার একটা ফ্যাক্টরিতে যেত। মাসে ৯০,০০০ ইয়েন আয় হতো, কিন্তু পড়াশোনার সময় বলতে কিছু থাকত না। শেষে সে কোন্সবিনিতে সুইচ করে, আয় কমলেও ক্লাসে মন দিতে পারল।
ফ্যাক্টরির জন্য সাধারণত ‘হাকেন’ কোম্পানির মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এদের কিছু নিয়ম কড়া—তোমার ভিসার ধরন, জাপানি ভাষার লেভেল (N4 হলেও চলে) সব দেখে নেয়।
কীভাবে আবেদন করবে: ধাপে ধাপে
প্রথমে তোমার স্কুলের ‘শৌকাই’ (ক্যারিয়ার সাপোর্ট) অফিসে যাও। তারা অনেক সময় নিয়োগকর্তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, ‘টাউন ওয়ার্ক’ বা ‘বাইটো রু’ ওয়েবসাইটে ফিল্টার দিয়ে খোঁজো। তৃতীয়ত, ইন্টারভিউয়ের জন্য জাপানি ভাষায় কিছু সাধারণ প্রশ্ন মুখস্থ রাখো—‘শুমি ওয়া নান দেশকা?’ (শখ কী?), ‘ইতসু করো কারে মাসুকা?’ (কখন কাজ শুরু করতে পারবে?)।
একটা কথা মনে রাখো: জাপানে পার্ট-টাইম কাজের জন্য ভিসার শর্ত হলো সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার বেশি নয়। আর ‘বৈধ’ কাজ করতে হবে—কোনো ক্যাশ জব নয়।
টাকা, সময় আর ভবিষ্যৎ
২০২৫ সালের হিসেবে, টোকিওতে মাসে খরচ (ঘরভাড়া, খাবার, যাতায়াত) প্রায় ৮০,০০০–১,০০,০০০ ইয়েন। পার্ট-টাইম করে তুমি ৬০,০০০–৯০,০০০ ইয়েন তুলতে পারো। অর্থাৎ পুরো খরচ উঠবে না, কিন্তু অর্ধেকের বেশি চলে যাবে। আমার অভিজ্ঞতায়, যারা সপ্তাহে ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করে, তাদের CGPA একটু কমে—এটা মেনে নিতে হবে।
তবে জাপানের সবচেয়ে বড় লাভ হলো—এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের অভিজ্ঞতা তোমাকে ভবিষ্যতে চাকরি খুঁজতে সাহায্য করে। অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এখান থেকে ‘এসএসডব্লিউ’ বা ‘ওয়ার্ক ভিসা’তে সুইচ করে।
আর হ্যাঁ, ‘study abroad from Bangladesh’ ভাবলে অনেকে প্রথমে IELTS-এর কথা ভাবেন। জাপানে অনেক স্কুল আছে যেখানে IELTS ছাড়াই ভর্তি হওয়া যায়—শুধু জাপানি ভাষা শিখলেই হয়। এটা একটা বড় প্লাস।
শেষে একটা পরামর্শ: প্রথম তিন মাস শুধু পড়াশোনা আর জাপানি ভাষা শিখো। তারপর কাজে ঢুকো। তাড়াহুড়ো করলে দুটোই নষ্ট হয়।
আমি ইনোছি গ্লোবাল এডুকেশন ইনস্টিটিউট-এ ছাত্রদের কাউন্সেলিং করি। আমাদের বরিশাল অফিস (নোবোগ্রাম রোড, মুসলিম পাড়া) থেকে অনেক শিক্ষার্থী জাপান গেছে। তুমি যদি ভিসা আর COE নিয়ে দ্বিধায় থাকো, আমাদের ভিসা ও COE সাপোর্ট সার্ভিসটি দেখতে পারো। আর বরিশালের অফিসের ঠিকানা ও সময় জানতে এই পেজে চোখ রাখো।
মন্তব্য
…