জাপানের ঋতু ও আবহাওয়া: শীতে টিকে থাকা, সাকুরা ও কোয়োর মজা, আর ব্যাগে কী নেবেন

প্রথম বছরের এক ছাত্র আমাকে ডিসেম্বরে মেসেজ করেছিল, "ভাই, সকালে সাইকেল চালাতে গিয়ে হাতের আঙুল অবশ হয়ে গেল।" সে টোকিওর কাছে সাইতামায় থাকত, আর দেশ থেকে নিয়ে গিয়েছিল শুধু একটা পাতলা জ্যাকেট। হাসির গল্প মনে হলেও এটা খুব সাধারণ ভুল। অথচ জাপানের ঋতু আসলে এই দেশের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি, শুধু একটু প্রস্তুতি লাগে।
আমি নিজে জাপানে থেকেছি, আর শত শত বাংলাদেশি স্টুডেন্টকে গাইড করেছি। তাই জাপানের ঋতু ও আবহাওয়া নিয়ে যা বলছি, তা বইয়ের কথা নয়, দেখা অভিজ্ঞতা।
কেন জাপান ভালো লাগবে
HSC-র পর বিদেশে পড়াশোনার কথা ভাবলে অনেকে শুধু খরচ আর ভিসা দেখে। আমি বলি, থাকার জায়গাটাও দেখুন। জাপান নিরাপদ, রাত ১১টায় স্টেশন থেকে একা হেঁটে ফেরা সেখানে স্বাভাবিক। ট্রেন প্রায় মিনিটের হিসাবে চলে, রাস্তা পরিষ্কার, আর মানুষ নিজের কাজ নিয়মমাফিক করে। আর চারটা ঋতু প্রতিটাই আলাদা দৃশ্য দেয়। হ্যাঁ, কম খরচে বিদেশে পড়াশোনা খুঁজলে জাপানকেও দেখা যায়, তবে বড় শহরে ভাড়া বেশি, সেটা পরে বলছি। বিস্তারিত খরচ দেখতে পারেন এই গাইডে।
বসন্ত: সাকুরা
মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত টোকিও, কিয়োটো, ওসাকায় সাকুরা ফোটে। এপ্রিলে নতুন সেশনও শুরু হয়, তাই অনেক স্টুডেন্টের প্রথম দিনের স্মৃতিই গোলাপি ফুলের নিচে। ইউয়েনো পার্ক বা মেগুরো নদীর পাড়ে বন্ধুদের সঙ্গে হানামি (ফুল দেখার পিকনিক) করা প্রায় একটা রীতি। খরচ কম, একটা ব্লু শিট, কনবিনির খাবার আর কয়েকশ ইয়েনেই হয়ে যায়।
সতর্কতা: ফুল টেকে মাত্র এক-দুই সপ্তাহ, বৃষ্টি হলে আরও কম। আর এই সময় ঠান্ডা পুরোপুরি যায় না, সকাল-সন্ধ্যায় জ্যাকেট লাগে। তারিখ প্রতি বছর বদলায়, তাই জাপান আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস দেখে নেবেন।
বর্ষা ও গ্রীষ্ম
বর্ষা (সুয়ু)
জুনের শুরু থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেশিরভাগ অঞ্চলে সুয়ু চলে। বাংলাদেশের বর্ষার মতো ঝমঝম বৃষ্টি না হলেও দিনের পর দিন ভেজা ভেজা থাকে, ঘরে স্যাঁতসেঁতে ভাব আর ছত্রাক হয়। একটা ভালো ছাতা আর ডিহিউমিডিফায়ার বা শুকনো রাখার ব্যবস্থা কাজে দেয়।
গ্রীষ্মের গরম
জুলাই-আগস্টে টোকিও-ওসাকায় তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৫ ডিগ্রির কাছাকাছি যায়, সঙ্গে আর্দ্রতা। বাংলাদেশিরা ভাবে অভ্যস্ত আছি, কিন্তু পার্টটাইমে খোলা জায়গায় বা কিচেনে কাজ করলে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি সত্যিই আছে। পানি আর লবণ-ট্যাবলেট নিয়ে চলুন, আর বিরতি নিতে লজ্জা পাবেন না। কাজ নিয়ে জানতে দেখুন পার্টটাইম জবের গাইড।
শরৎ: কোয়ো
নভেম্বরে কিয়োটোর তোফুকুজি মন্দির বা টোকিওর ইচোর সোনালি সারি দেখে অনেকে চুপ হয়ে যায়। জাপানে অটাম লিভস বা কোয়ো মানে লাল, কমলা আর হলুদের উৎসব। আবহাওয়াও তখন সবচেয়ে আরামদায়ক, পড়াশোনা আর ঘোরাঘুরি দুটোর জন্যই ভালো সময়। জনপ্রিয় জায়গায় ভিড় বেশি, তাই সকালে যান।
শীতে টিকে থাকা
জাপানের শীতে কী পরবেন, এটাই সবচেয়ে বেশি আসা প্রশ্ন। টোকিও-ওসাকায় ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি তাপমাত্রা প্রায় ০-১০ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরে। হোক্কাইডো বা তোহোকুতে বরফ আর মাইনাসও হয়। আসল কৌশল হলো লেয়ারিং।
- ভেতরে ইউনিক্লোর হিটটেক (Heattech) ইনার, এটা জাপানে গিয়েই কেনা সহজ ও সস্তা
- মাঝে সোয়েটার বা ফ্লিস
- বাইরে বাতাস আটকানো কোট বা ডাউন জ্যাকেট
- গ্লাভস, মাফলার, উলের মোজা
- ঘরের জন্য পুরু মোজা বা স্লিপার, কারণ মেঝে ঠান্ডা
পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে সেন্ট্রাল হিটিং থাকে না। এয়ারকন বা কেরোসিন হিটার চালালে বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল বাড়ে, মাসে কয়েক হাজার ইয়েন বেশি লাগতে পারে (আনুমানিক, শহর ও ব্যবহারে বদলায়)।
দেশ থেকে ব্যাগে কী নেবেন
জাপানে what to pack নিয়ে অতিরিক্ত বোঝা বাড়াবেন না। ভারী শীতের পোশাক বেশিরভাগ ওখানেই সস্তায় পাবেন। দেশ থেকে নিন:
- পাসপোর্ট, COE, ভিসার কাগজ, সার্টিফিকেটের কপি
- নিজের নিয়মিত ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন (জাপানের নিয়ম আগে যাচাই করুন)
- পরিচিত মসলা অল্প পরিমাণে, তবে মাংস বা ফলজাত জিনিসের নিয়ম দেখে নিন
- দুই-তিন সেট ফর্মাল পোশাক ইন্টারভিউ বা অনুষ্ঠানের জন্য
- ইউনিভার্সাল অ্যাডাপ্টার, যদিও জাপানে প্লাগ সাধারণত দুই পিনের
প্রথম মাসের জন্য কিছু নগদ ইয়েন রাখুন। পরে জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি পাবেন লিভিং ইন জাপান গাইডে, আর শহর বেছে নিতে দেখুন জাপানের শহরগুলো। এই পরামর্শ শুধু আবহাওয়া নিয়ে নয়। অনেকে IELTS ছাড়া বিদেশে পড়াশোনা খোঁজে, জাপানে ভাষা-ভিত্তিক পথ আছে, তবে যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা, তাই যোগ্যতার পাতা দেখে নিন।
একটা সৎ কথা
জাপান সুন্দর, কিন্তু প্রথম শীত আর প্রথম গ্রীষ্ম কঠিন লাগতে পারে। বাড়ির জন্য মন খারাপ হবে, আর পড়াশোনা-কাজ একসঙ্গে সামলাতে ক্লান্তি আসবে। এটা স্বাভাবিক। তবে একবার ছন্দে এলে, এপ্রিলের সাকুরা আর নভেম্বরের কোয়ো আপনাকে অন্য রকম এক জীবন দেবে।
আমি ইনোচি গ্লোবাল এডুকেশন ইনস্টিটিউটের নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া, কলেজ রোডের অফিসে স্টুডেন্টদের কাউন্সেলিং করি। জাপানে পড়তে চাইলে আমাদের জাপানে পড়াশোনার সহায়তা সেবা নিয়ে এসে কথা বলতে পারেন, চা খেতে খেতে আপনার প্ল্যানটা একসঙ্গে দেখব।
মন্তব্য
…