জাপানে পার্টটাইম কাজ: ২৮ ঘণ্টার নিয়ম ও মাসিক আয়ের বাস্তব চিত্র

আপনি হয়তো ভাবছেন, জাপানে পড়তে গেলে খরচ কেমন হবে? টিউশন ফি, থাকা-খাওয়া—সব মিলিয়ে টাকার অঙ্কটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থীই আমাকে জিজ্ঞেস করে, “স্যার, জাপানে পড়তে গিয়ে কি নিজের খরচ নিজে তুলতে পারব?” উত্তরটা সহজ না, তবে সম্ভব। জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা আর কাজের সংস্কৃতি এমন যে, সেখানে পড়ার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করে অনেকেই নিজের খরচ চালায়। তবে তার জন্য জানতে হবে নিয়মকানুন, আর বাস্তব চিত্র।
জাপানে পার্টটাইম কাজ: ২৮ ঘণ্টার নিয়ম
জাপানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কাজের একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সেটা হলো, সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮ ঘণ্টা কাজ করা যাবে। ছুটির দিনে (স্কুল বন্ধ থাকলে) দিনে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করা যায়, কিন্তু সপ্তাহে মোট ২৮ ঘণ্টার বেশি নয়। এই নিয়মটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর বেশি কাজ করলে আপনার ভিসা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কাজের অনুমতি (Work Permit)
জাপানে এসে প্রথমে আপনার পাসপোর্ট আর রেসিডেন্স কার্ড নিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে “পারমিট টু ইঞ্জেজ ইন অ্যাক্টিভিটি অদার দ্যান দ্যাট পারমিটেড” নামের একটা অনুমতি নিতে হবে। এটা ছাড়া কাজ করা বেআইনি। এই অনুমতি পেতে কোনো সমস্যা হয় না, তবে কোর্স শুরুর পরই আবেদ্য করতে হবে।
প্রতি ঘণ্টায় কত পাবেন?
জাপানে ন্যূনতম মজুরি (minimum wage) প্রতি প্রিফেকচারে আলাদা। যেমন, টোকিওতে ২০২৩ সালে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১,১১৩ ইয়েন (আনুমানিক ৮৫০ টাকা)। অন্যান্য অঞ্চলে একটু কম হতে পারে। তবে শিক্ষার্থীরা সাধারণত যে কাজগুলো করে, সেগুলোতে ঘণ্টাপ্রতি ১,০০০–১,২০০ ইয়েন পেয়ে থাকেন।
কাজের ধরনও বেতনকে প্রভাবিত করে। যেমন:
- কনভিনিয়েন্স স্টোর (7-Eleven, FamilyMart) — প্রতি ঘণ্টায় ১,০০০–১,১০০ ইয়েন
- রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফে — ১,০০০–১,২০০ ইয়েন
- ফ্যাক্টরি অ্যাসেম্বলি — ১,১০০–১,৩০০ ইয়েন (রাতের শিফটে বেশি)
- তুতোরিং (বাংলা বা ইংরেজি শেখানো) — ১,৫০০–২,০০০ ইয়েন
আপনি যত বেশি জাপানি ভাষায় দক্ষ হবেন, তত ভালো বেতনের কাজ পাবেন। এ কারণেই JLPT পরীক্ষা দেওয়া এত জরুরি।
মাসে কত আয় করা সম্ভব?
যদি সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা কাজ করেন, আর ঘণ্টাপ্রতি ১,০০০ ইয়েন পান, তাহলে সপ্তাহে ২৮,০০০ ইয়েন, আর মাসে প্রায় ১১২,০০০ ইয়েন (প্রায় ৮৫,০০০ টাকা)। তবে অনেকেই ছুটির দিনে বেশি কাজ করে এই অঙ্ক আরেকটু বাড়িয়ে তোলেন। আবার কেউ কেউ ২৮ ঘণ্টার কম কাজ করে পড়াশোনায় মন দেন।
খরচের হিসাব
টোকিওতে থাকা-খাওয়া আর অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে প্রায় ১২০,০০০–১৫০,০০০ ইয়েন লাগে। অর্থাৎ, পার্টটাইম কাজের আয় দিয়ে মোটামুটি থাকা-খাওয়ার খরচ চলে যেতে পারে, তবে টিউশন ফি আর বইপত্রের খরচ বাবদ অতিরিক্ত টাকা লাগবে। তাই বাস্তবতা হলো, নিজের খরচ নিজে তুলতে পারলেও পুরো খরচ মেটানো কঠিন।
আমার এক শিক্ষার্থী ছিল, সে টোকিওর শিনাগাওয়া ওয়ার্ডে একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করত। ও বলত, “স্যার, কাজ করতে করতে জাপানি ভাষাটাও শিখে গেছি।” সত্যিই, কাজের মাধ্যমে ভাষা শেখার সুযোগ অনেক।
কাজের সুবিধা আর সতর্কতা
পার্টটাইম কাজ শুধু আয়ের উৎস নয়, জাপানি সংস্কৃতি আর ভাষা শেখার দারুণ একটি মাধ্যম। তবে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
যেসব কাজ এড়িয়ে চলবেন
যেসব কাজে রাতের শিফট বেশি, যেমন নাইট ক্লাব বা বার—এগুলো থেকে দূরে থাকাই ভালো। জাপানে নিয়ম আছে, রাত ১০টার পর কাজ করা নিষিদ্ধ শিক্ষার্থীদের জন্য (যদিও ব্যতিক্রম আছে)। আর অবশ্যই কাজের সময়সূচি এমনভাবে সাজাবেন যেন পড়াশোনায় সমস্যা না হয়।
ভিসার নিয়ম মনে রাখুন
২৮ ঘণ্টার নিয়ম ভাঙলে কিন্তু আপনি ঝুঁকিতে পড়বেন। ইমিগ্রেশন অফিসে ধরাও পড়তে পারেন, আর তখন ভিসা বাতিল পর্যন্ত হতে পারে। তাই নিয়ম মেনেই কাজ করবেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তব পরামর্শ
প্রথম দিকে জাপানি ভাষা ভালো না জানলে ভালো কাজ পাওয়া কঠিন। তাই জাপানি ভাষা শেখার ওপর জোর দিন। স্কুলে ভর্তির আগে থেকেই JLPT N4 বা N3 লেভেলের প্রস্তুতি নিয়ে গেলে কাজ পাওয়া সহজ হবে।
আরেকটি কথা—জাপানে যাওয়ার আগে কিছু সঞ্চয় থাকা দরকার। প্রথম ২-৩ মাস কাজ না পেলেও যেন খরচ চালাতে পারেন। যাওয়ার আগে প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের সাথে কথা বলতে পারেন।
সবশেষে
জাপানে পার্টটাইম কাজ শিক্ষার্থীদের জন্য দারুণ এক সুযোগ। তবে এটা ভাবলে ভুল হবে যে শুধু কাজ করেই সব খরচ উঠবে। পড়াশোনাটাই মূল উদ্দেশ্য, কাজ হলো সহায়ক। তাই নিজের সময়টাকে সঠিকভাবে বণ্টন করবেন।
আপনি যদি জাপানে পড়তে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাহলে এলিজিবিলিটি আর ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে জেনে নিন। আর কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমরা আছি আপনার পাশে।
মন্তব্য
…