জাপানে স্ত্রী/স্বামীকে নিয়ে পড়তে যাবেন? ডিপেন্ডেন্ট ভিসার নিয়ম ও আয়ের শর্ত

আপনি কি HSC শেষ করে জাপানে পড়তে যাচ্ছেন, আর মনে মনে ভাবছেন — স্ত্রী বা স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন? এই প্রশ্নটা আমার কাছে প্রায়ই আসে। একদম সোজা উত্তর নেই, তবে নিয়মটা একবার বুঝে নিলে পথটা অনেক পরিষ্কার।
আমি নিজে জাপানে ছিলাম, আর এখন প্রতিদিন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করি। তাই জাপানের ভিসা নিয়ম, টাকার হিসাব আর বাস্তব চিত্রটা জানি। চলুন, গুছিয়ে বলি।
ডিপেন্ডেন্ট ভিসা কী এবং কারা পাবেন?
জাপানে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা সাধারণত '留学' (রিউগাকু) বা স্টুডেন্ট ভিসায় থাকেন। এই ভিসার ওপর নির্ভর করে আপনার স্ত্রী বা স্বামী '家族滞在' (কাজোকু তাইজাই) বা ডিপেন্ডেন্ট ভিসা পেতে পারেন। তবে শর্ত আছে — আপনাকে অবশ্যই পূর্ণকালীন (full-time) শিক্ষার্থী হতে হবে। ভাষা স্কুলেও এই ভিসা পাওয়া যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ।
কাদের জন্য ডিপেন্ডেন্ট ভিসা প্রযোজ্য?
- আইনি স্বামী বা স্ত্রী
- অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান (সাধারণত ১৮ বছরের নিচে)
বান্ধবী বা বাগদত্তাকে এই ভিসায় আনা যায় না। বিয়ের সনদ, জন্মনিবন্ধন ইত্যাদি সাপেক্ষে আবেদন করতে হয়।
আয়ের শর্ত: কত টাকা থাকতে হবে?
প্রশ্ন হলো—জাপান সরকার চায় আপনি আপনার পরিবারকে আর্থিকভাবে সামর্থ্য দিতে পারবেন। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া নেই। তবে ইমিগ্রেশন অফিস সাধারণত দেখে—আপনার কাছে প্রতি মাসে প্রায় ৮০,০০০ থেকে ১০০,০০০ ইয়েন (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬০-৭৫ হাজার টাকা, যা বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে) অতিরিক্ত আয় বা সঞ্চয় আছে কি না।
ধরুন, আপনার নিজের পড়ার খরচ আর থাকা-খাওয়ার জন্য বছরে ১.৫ মিলিয়ন ইয়েন লাগে। স্ত্রীকে আনতে হলে সেই অঙ্কের ওপরে আরও ১ মিলিয়ন ইয়েন যোগ্যতা হিসেবে দেখাতে হবে। তবে এটি শুধু একটি ধারণা—আসল সিদ্ধান্ত কেস-বাই-কেস।
আয়ের উৎস কী হতে পারে?
- আপনার ব্যাংকে জমা থাকা টাকার স্টেটমেন্ট
- অভিভাবকের সহায়তার হলফনামা ও আর্থিক নথি
- স্কলারশিপের পরিমাণ (যদি থাকে)
- আপনার বা স্ত্রীর পার্টটাইম আয় (তবে এটি মুখ্য নয়)
মনে রাখবেন, আবেদনের সময় আপনার ‘সাপোর্টিং ডকুমেন্ট’ যত পরিষ্কার থাকবে, ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
পার্টটাইম কাজের সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা
ডিপেন্ডেন্ট ভিসায় থাকা স্ত্রী/স্বামীকে জাপানে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়—তবে সাপ্তাহিক ২৮ ঘণ্টার বেশি নয়। এটি স্টুডেন্ট ভিসার মতোই। তবে একটি বড় কথা—যারা ডিপেন্ডেন্ট ভিসায় থাকেন, তারা সাধারণত ফুল-টাইম চাকরি পান না। ফলে সংসারের পুরো খরচ আপনার পড়াশোনা আর দুইজনের পার্টটাইম আয়ে চালাতে হবে।
আমি একজন শিক্ষার্থীকে চিনতাম, যে তার স্ত্রীকে টোকিওর নাকানো (中野) ওয়ার্ডে নিয়ে এসেছিল। স্ত্রী প্রথমে একটি কমবিনি স্টোরে পার্টটাইম করতেন, পরে ক্যাফেতে চলে যান। কিন্তু প্রথম তিন মাস ভাষা না জানায় খুব কষ্ট হয়েছিল। তাই আমার পরামর্শ—স্ত্রীকে নিয়ে আসার আগে জাপানি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান থাকা জরুরি।
খরচের হিসাব: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
জাপানকে আমি সাশ্রয়ী গন্তব্য বলি, কারণ ইউরোপ বা আমেরিকার তুলনায় শিক্ষার খরচ অনেক কম। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে ৫৩৫,৮০০ ইয়েন (প্রায় ৪ লাখ টাকা) টিউশন ফি, আর বেসরকারিতে ৭-৮ লাখ ইয়েন পর্যন্ত হতে পারে। তবে ঢাকায় ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে গেলেও যে খরচ, জাপানে পড়তে গেলে সে তুলনায় যুক্তিসঙ্গত।
এখন স্ত্রীকে আনতে গেলে অতিরিক্ত খরচ যোগ হবে—থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা বীমা। টোকিওর বাইরে থাকলে খরচ কম, যেমন ওসাকা বা ফুকুওকায় এক রুম অ্যাপার্টমেন্ট ৪০-৫০ হাজার ইয়েনে পাওয়া যায়।
তবে সতর্ক থাকুন—বাংলাদেশ থেকে পাঠানো টাকার ওপর নির্ভর না করে, জাপানে আয়ের একটি স্থিতিশীল উৎস তৈরি করুন। নইলে তিন মাসের মাথায় হিমশিম খেতে হবে।
টাইমলাইন: কখন আবেদন করবেন?
সাধারণত আপনার স্টুডেন্ট ভিসা পেয়ে জাপানে পৌঁছানোর পর ডিপেন্ডেন্ট ভিসার আবেদন করা হয়। তবে আপনি দেশে থাকাকালীন জাপানের ইমিগ্রেশন অফিসে আবেদন করতে পারবেন, কিন্তু প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে।
- প্রথমে আপনার নিজের ভিসা ও স্কুলের ভর্তি নিশ্চিত করুন
- তারপর স্ত্রী/স্বামীর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করুন
- জাপানে ঢুকে স্থানীয় ইমিগ্রেশন অফিসে আবেদন করুন
- অনুমোদন পেতে ১-৩ মাস লাগতে পারে
এই সময়ে স্ত্রী বা স্বামী বাংলাদেশে থাকবেন, তাই দীর্ঘ বিরতির পরিকল্পনা করুন।
ঝুঁকি ও সৎ পরামর্শ
সবকিছু সুন্দর নয়। ডিপেন্ডেন্ট ভিসা মানেই যে আপনি পাশে পাবেন, সেটা নিশ্চিত নয়। ভাষা না জানা, কাজের অনুমতির সময়সীমা, আর আর্থিক চাপ—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক দম্পতি সম্পর্কের টানাপোড়েনেও পড়েন। তাই ভালো করে ভাবুন—আপনার পড়াশোনার প্রথম বছর একা কাটানো কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে? অনেকেই প্রথম বছর একা থেকে স্ত্রীকে পরে নিয়ে আসেন।
আরেকটি কথা—জাপানে সন্তান হলে তার খরচ, স্কুলের ব্যবস্থা—সব মাথায় রাখতে হবে। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা ভালো, তবে খরচও আছে।
সঠিক পথে এগোন
এখন আপনার কাজ হলো তথ্য যাচাই করা। ভিসার নিয়ম, আয়ের প্রয়োজনীয়তা—এগুলো সময়ে বদলায়। আমি বলি, আমাদের অফিসে এসে একবার কথা বলে যান।
আমি Inochi Global Education Institute-এ শিক্ষার্থীদের কাউন্সেল করি, আমাদের বরিশাল (নবগ্রাম রোড, মুসলিম পাড়া) অফিসে। আপনারা চাইলে ভিসা ও CoE সাপোর্ট সার্ভিস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন।
আপনার স্বপ্ন যেন সত্যি হয়, সেই পথে আমরা পাশে আছি।
মন্তব্য
…