জাপানে প্রথম মাস বেঁচে থাকার গাইড: অ্যাপার্টমেন্ট, সিম, ব্যাংক, কোবান

জাপানে পা রাখার পর প্রথম মাসটা মনে হয় যেন এক অদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে আছেন। চারপাশের সবকিছু—ভাষা, লোকজন, দোকানপাট, ট্রেনের সময়সূচি—সবই নতুন। আমি যখন প্রথম টোকিওতে পৌঁছাই, শিনজুকু স্টেশন থেকে বেরিয়ে এতগুলো সাইনবোর্ড দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়গুলো সহজ হয়ে যায়। এই ব্লগে আমি আপনাকে প্রথম মাসের চারটি বড় কাজ—অ্যাপার্টমেন্ট, সিম, ব্যাংক, আর কোবান—সম্পর্কে বিস্তারিত বলব।
১. অ্যাপার্টমেন্ট খোঁজা ও চুক্তি
জাপানে থাকার জায়গা খোঁজা অন্য দেশের থেকে একটু আলাদা। এখানে ‘লিভিং উইথ জাপানিজ’ বা ‘হোমস্টে’ থেকে শুরু করে ‘শেয়ার হাউস’ আর ‘এপার্টমেন্ট’—বিভিন্ন অপশন আছে। আমি সাধারণত ছাত্রদের শেয়ার হাউসে শুরু করতে বলি, কারণ এতে খরচ কম হয় আর জাপানি ভাষা শেখার সুযোগ বেশি।
শেয়ার হাউস বনাম এপার্টমেন্ট
শেয়ার হাউসে ইউটিলিটি বিল আর ইন্টারনেট সাধারণত ভাড়ার মধ্যেই থাকে। অন্যদিকে নিজের এপার্টমেন্ট নিতে গেলে ‘গ্যারান্টার’ (জামিনদার) লাগে, যা অনেক বিদেশির জন্য ঝামেলা। কিছু কোম্পানি যেমন ‘লিও প্যালেস’ বা ‘ডোরি’ বিদেশিদের জন্য বিশেষ প্ল্যান দেয়।
- ভাড়া: টোকিওর বাইরে ৪০,০০০–৬০,০০০ ইয়েন, টোকিওতে ৬০,০০০–৮০,০০০ ইয়েন (প্রায় ৪৮,০০০–৯৬,০০০ টাকা)।
- গ্যারান্টার ফি: সাধারণত ১ মাসের ভাড়া সমান।
- কি মানি (চাবির টাকা): ২–৩ মাসের ভাড়া অগ্রিম দিতে হয়।
শেয়ার হাউসের জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় লিস্ট থেকে কাছাকাছি এলাকা বেছে নিন। যেমন, টোকিওর ‘ইকেবুকুরো’ এলাকায় অনেক সাশ্রয়ী শেয়ার হাউস আছে।
২. সিম কার্ড ও মোবাইল প্ল্যান
জাপানে সিম কেনা অনেক সহজ এখন। কিন্তু প্রথমে জেনে রাখা ভালো—এখানে ‘প্রিপেইড’ আর ‘পোস্টপেইড’ দুটোই চলে। আপনার ছাত্র ভিসা থাকলে সাধারণত পোস্টপেইড নেওয়া সহজ, কিন্তু প্রিপেইড দিয়েও শুরু করতে পারেন।
প্রস্তাবিত অপারেটর
- IIJmio বা Rakuten Mobile—এগুলো সস্তা আর বিদেশি নিবন্ধনে সহায়তা করে।
- Y!mobile—একটু দামি কিন্তু ইংরেজি সাপোর্ট ভালো।
সিম কিনতে আপনার পাসপোর্ট আর রেসিডেন্স কার্ড লাগবে। দোকানে গিয়ে ‘গাকুসেই (ছাত্র) প্ল্যান’ বললে ডিসকাউন্ট পেতে পারেন। আমি নিজে প্রথম মাসে IIJmio ব্যবহার করেছিলাম—মাসে ২,৫০০ ইয়েনে ২০ জিবি ডেটা, যা যথেষ্ট।
আরেকটা টিপস: জাপানে ‘ওয়াই-ফাই রাউটার’ ভাড়া নেওয়াও জনপ্রিয়। কিন্তু সিম দিয়ে শুরু করাই ভালো, কারণ পরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় জাপানি ফোন নম্বর লাগবে।
৩. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা
জাপানে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়া পার্টটাইম কাজের বেতন পাওয়া যায় না। তাই দ্রুততম সময়ে অ্যাকাউন্ট খোলা জরুরি। বেশিরভাগ ব্যাংক বিদেশি ছাত্রদের জন্য ‘ইউচো ব্যাংক’ (Japan Post Bank) সুপারিশ করে।
কী কী লাগবে?
- পাসপোর্ট ও রেসিডেন্স কার্ড
- জাপানি ঠিকানা (অ্যাপার্টমেন্টের ঠিকানা)
- হানকো (নামের সিল)—যদিও এখন স্বাক্ষরও চলে
ব্যাংকে গিয়ে বলুন ‘কোজা ও হিরাকিতাই’ (আমি অ্যাকাউন্ট খুলতে চাই)। প্রথমবার কিছু ফর্ম পূরণ করতে হবে—সব জাপানি, তাই কাউকে সাথে নিয়ে যাওয়া ভালো। আমি আমার প্রথম অ্যাকাউন্ট খুলেছিলাম শিন-ওকুবো এলাকায়, যেখানে নেপালি স্টাফ ছিলেন, তাই কথা বলা সহজ হয়েছিল।
অ্যাকাউন্ট খোলার পরই আপনার স্কলারশিপের টাকা জমা দিতে পারেন। আর মনে রাখবেন, জাপানের ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ প্রায় শূন্য, তাই বেশি টাকা রাখবেন না—বরং খরচের টাকা আলাদা করুন।
৪. কোবান (পুলিশ বক্স) ও জরুরি পরিষেবা
জাপানের কোবান (পুলিশ বক্স) শুধু অপরাধ দমনের জন্য নয়, এটি এলাকার তথ্যকেন্দ্র। আপনার যদি ঠিকানা খুঁজতে সমস্যা হয় বা কিছু জিজ্ঞেস করতে চান, কোবানে গিয়ে সাহায্য চাইতে পারেন। তারা সাধারণত ইংরেজি বুঝতে পারেন না, কিন্তু ছবি বা ম্যাপ দেখালে কাজ হয়।
জরুরি নম্বর
- পুলিশ: 110
- অ্যাম্বুলেন্স/ফায়ার: 119
এছাড়া ‘ইংলিশ হেল্পলাইন’ (03-3501-0111) আছে, যা ২৪ ঘণ্টা চলে। প্রথম মাসে আমি একবার ট্রেনে ব্যাগ ফেলে দিয়েছিলাম—কোবানে গিয়ে বলতেই তারা ৩০ মিনিটের মধ্যে খুঁজে দিয়েছিল। সত্যিই জাপানের পুলিশ খুব বিশ্বস্ত।
৫. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ
প্রথম মাসে আরও কয়েকটা কাজ সেরে নিন:
- রেসিডেন্স কার্ডের ঠিকানা আপডেট: আপনার জায়গা চূড়ান্ত হওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে ওয়ার্ড অফিসে গিয়ে রেজিস্টার করুন।
- ন্যাশনাল হেলথ ইন্স্যুরেন্সে এনরোল: এটা মাসে প্রায় ২,০০০ ইয়েন, কিন্তু জরুরি অবস্থায় বড় সুরক্ষা।
- পার্টটাইম কাজের অনুমতি: ইমিগ্রেশন থেকে ‘পার্মিট টু এনগেজ ইন অ্যাক্টিভিটি আদার দ্যান দ্যাট পারমিটেড’ ফর্ম নিন।
জাপানের JLPT ক্যালেন্ডার মাথায় রাখুন—প্রথম মাসেই পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন। আর যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমরা প্রায়ই ছাত্রদের ওরিয়েন্টেশন করি, যেখানে এই বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখাই।
প্রথম মাসটা কঠিন লাগলেও মনে রাখবেন—প্রতিদিন একটু করে সবকিছু শিখবেন। আমি নিজে প্রথম সপ্তাহে সুপারমার্কেটে কীভাবে পয়েন্ট কার্ড নিতে হয় তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখন তো মজা করেই বলি, জাপান আমার দ্বিতীয় বাড়ি। আপনার জন্যও তাই হবে। শুধু ধৈর্য ধরুন আর সাহায্য চাইতে লজ্জা করবেন না।
আপনার জাপান যাত্রা শুভ হোক!
মন্তব্য
…