জাপানে পার্টটাইম কাজ: ২৮ ঘণ্টার নিয়ম ও মাসিক আয়ের বাস্তব হিসাব

জাপানে পড়তে যাওয়ার কথা ভাবছেন? অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “ভাইয়া, জাপানে পড়তে গেলে কি পার্টটাইম কাজ করা যাবে? মাসে কত টাকা ওঠে?” আজ আমি সেই প্রশ্নেরই বাস্তব উত্তর দেব। শুধু নিয়ম নয়, আমার নিজের দেখা অভিজ্ঞতা আর হিসাব-নিকাশও শেয়ার করব।
২৮ ঘণ্টার নিয়মটা আসলে কী?
জাপানে আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮ ঘণ্টা পার্টটাইম কাজ করার অনুমতি আছে। তবে এই নিয়মটা সব ক্ষেত্রে এক নয়। ছুটির সময় (গ্রীষ্ম, শীত, বসন্ত) দিনে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করা যায়। মনে রাখবেন, কাজ করার আগে অবশ্যই ‘অনুমতিপত্র’ (পারমিট) নিতে হবে। ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে ফ্রি ফর্ম পূরণ করলেই হয়।
কিন্তু সতর্ক থাকুন—অনেকে ২৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, আর ধরা পড়লে ভিসা বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই নিয়ম মেনে চলাই ভালো। আমি একজন ছাত্রকে চিনি, যে ৩৫ ঘণ্টা কাজ করত, একদিন ইমিগ্রেশন অফিসার তার স্কুলে এসে হাজির। শেষে অনেক কষ্টে বেঁচে গেছে।
ঘণ্টায় আয় কত?
জাপানের প্রতিটি প্রিফেকচারে ন্যূনতম মজুরি আলাদা। টোকিওতে বর্তমানে (২০২৪-২৫) প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১,১৬৩ ইয়েন। অন্যান্য শহরে একটু কম হতে পারে, যেমন ওসাকায় ১,১১১ ইয়েন, ফুকুওকায় ৯৪১ ইয়েন। তবে অভিজ্ঞতা ও কাজের ধরনের উপর ভিত্তি করে আরও বেশি পাওয়া যায়।
- কনভিনিয়েন্স স্টোর (৭-Eleven, FamilyMart): ১,১০০–১,২০০ ইয়েন/ঘণ্টা
- রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফে: ১,০৫০–১,২০০ ইয়েন/ঘণ্টা
- ইংরেজি বা বাংলা টিউশন: ১,৫০০–২,৫০০ ইয়েন/ঘণ্টা
- ফ্যাক্টরি বা গুদাম: ১,২০০–১,৪০০ ইয়েন/ঘণ্টা
এছাড়া রাতের শিফটে কাজ করলে ২৫% বেশি মজুরি পান। যেমন রাত ১০টা থেকে সকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ করলে প্রতি ঘণ্টায় ১,৪৫০ ইয়েন পর্যন্ত হতে পারে।
মাসে কত টাকা ওঠে?
ধরা যাক, আপনি টোকিওতে থাকেন এবং সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা কাজ করেন। তাহলে হিসাবটা এমন: ২৮ × ১,১৬৩ = ৩২,৫৬৪ ইয়েন প্রতি সপ্তাহে। মাসে ৪ সপ্তাহ ধরে নিলে প্রায় ১,৩০,০০০ ইয়েন। তবে বাস্তবে আপনি সবসময় ২৮ ঘণ্টা পাবেন না—কখনো ২০, কখনো ২৫ ঘণ্টা। তাই মাসে গড়ে ৯০,০০০–১,২০,০০০ ইয়েন আয় হওয়া স্বাভাবিক। বাংলাদেশি টাকায় (প্রতি ১ ইয়েন = ০.৭৫ টাকা ধরে) এটা প্রায় ৬৭,০০০–৯০,০০০ টাকা।
অনেকে আবার বলবে, “ওরে বাবা, এ তো অনেক টাকা!” কিন্তু মনে রাখবেন, জাপানে থাকা-খাওয়ার খরচও অনেক। টোকিওতে ছোট রুম ভাড়া ৫০,০০০–৭০,০০০ ইয়েন, খাবার-যাতায়াত বাবদ আরও ৩০,০০০–৪০,০০০ ইয়েন। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, পার্টটাইম আয় দিয়ে শুধু খরচ চালানোই সম্ভব, সঞ্চয় করা কঠিন।
কোন কাজগুলো ভালো?
নতুনদের জন্য কনভিনিয়েন্স স্টোর বা সুপারমার্কেট ভালো, কারণ কাজ শেখা সহজ এবং জাপানি ভাষা শেখার সুযোগ হয়। তবে ইংরেজি বা নিজের ভাষা শেখানোর কাজে আয় বেশি, কিন্তু সেটা সবাই পায় না। অনেক বাংলাদেশি ছাত্র রেস্টুরেন্টে ডিশওয়াশার বা রান্নাঘরের কাজ করে থাকেন।
আমি নিজে প্রথম বছর কনভিনিয়েন্স স্টোরে কাজ করেছি। প্রথম দিকে জাপানি ভাষা বুঝতে পারতাম না, কিন্তু সহকর্মীরা খুব সাহায্য করত। ধীরে ধীরে ভাষা শিখে এখন অন্য কাজও করতে পারি। তাই কাজ শুধু টাকার জন্য নয়, ভাষা শেখারও একটা মাধ্যম।
কাজ খুঁজবেন কীভাবে?
জাপানে কাজ খোঁজার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় হলো টাউনওয়ার্ক (TownWork) বা বাইটো (Baito) নামের ওয়েবসাইট। এছাড়া স্কুলের নোটিশ বোর্ডেও কাজের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। অনেক দোকানে “কাজ করবে এমন কাউকে খুঁজছি” লেখা থাকে। তবে ভিসা নিয়মের কারণে শুধু ‘সাপোর্টিং ইনকাম’ হিসেবে কাজ করা যায়, মূল জীবিকা হিসেবে নয়।
সতর্কতা ও পরামর্শ
জাপানে কাজের পরিবেশ অনেক ভালো, কিন্তু কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। যেমন—কখনোই ২৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করবেন না, কারণ ধরা পড়লে ভিসা বাতিল। আর এমন কাজ করবেন না যেটা আপনার পড়াশোনার সাথে বাধা সৃষ্টি করে। মনে রাখবেন, জাপানে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো পড়াশোনা।
কাজ করবেন, কিন্তু পড়ালেখা যেন পিছিয়ে না যায়। কারণ পড়ালেখাই আপনার ভিসা টিকিয়ে রাখবে।
আরেকটা কথা—জাপানি ভাষা যত ভালো জানবেন, কাজ পাওয়া তত সহজ হবে। JLPT N3 বা তার বেশি থাকলে ভালো কাজ পাবেন। তাই JLPT পরীক্ষার তারিখ জেনে আগে থেকে প্রস্তুতি নিন।
সবশেষে, জাপান সত্যিই সুন্দর একটি দেশ। এখানে কাজ করতে করতে আপনি শুধু টাকা রোজগারই করবেন না, জানবেন নতুন সংস্কৃতি, নতুন মানুষ। কিন্তু তবুও বলব—হিসাবটা বুঝে তারপর সিদ্ধান্ত নিন। আর্থিক পরিকল্পনা ভালো করে করুন, নইলে চাপে পড়বেন।
যদি জাপানে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে আমাদের এলিজিবিলিটি চেক আর স্কলারশিপ অপশন দেখে নিন। আর কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার স্বপ্ন পূরণে আমরা পাশে আছি।
মন্তব্য
…