জাপানে পড়তে গেলে জানতে হবে: অনসেন, আবর্জনার নিয়ম ও ট্রেনে শিষ্টাচার

আমি প্রায়ই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বলি, জাপানে পড়তে যাওয়ার আগে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যই নয়, বরং সেখানকার দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট নিয়মগুলো জানাটাও জরুরি। কারণ এই নিয়মগুলোই আপনার জীবনকে সহজ বা কঠিন করে তুলবে। আজ আমি তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো যা প্রত্যেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জানা উচিত: অনসেন, আবর্জনার নিয়ম ও ট্রেনের শিষ্টাচার।
অনসেন (温泉) : গরম পানির ঝরনায় স্নানের নিয়ম
জাপানের অনসেন বা গরম পানির ঝরনা সারা বিশ্বে বিখ্যাত। কিন্তু সেখানে স্নানের কিছু নিয়ম আছে যা না জানলে বিব্রত হতে পারেন। প্রথমত, অনসেনে প্রবেশের আগে পুরোপুরি কাপড় খুলে ফেলতে হয়। আপনি যে কোনো জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই অনসেন পাবেন, বিশেষ করে টোকিওর মতো বড় শহরেও। যেমন ইকেবুকুরোর কাছে 'ওয়ানসেন' নামে একটি বিখ্যাত অনসেন আছে। সেখানে গেলে দেখবেন, ঢোকার আগে জুতা খুলে লকারে রাখতে হবে। তারপর সাবান দিয়ে ভালোভাবে গোসল করে নিতে হবে—পুলে নামার আগে শরীর পুরোপুরি পরিষ্কার করতে হবে। পুলে তোয়ালে নেওয়া যায় না, শুধু মাথায় ছোট তোয়ালে রাখা যায়।
একবার আমি এক বাংলাদেশি ছাত্রকে নিয়ে অনসেনে গিয়েছিলাম। সে প্যান্ট পরে পুলে নামতে চেয়েছিল—আমি তাড়াতাড়ি বাধা দিলাম। পরে তাকে নিয়মগুলো বুঝিয়ে বলি। সে খুব লজ্জা পেয়েছিল, কিন্তু শিখে গিয়েছিল।
মনে রাখবেন:
- অনসেনে প্রবেশের আগে সম্পূর্ণ নগ্ন হতে হবে।
- পুলে নামার আগে গোসল করে নিন।
- ছোট তোয়ালে মাথায় রাখতে পারেন, কিন্তু পানিতে ডোবাবেন না।
- যাদের শরীরে ট্যাটু আছে, তারা কিছু অনসেনে প্রবেশ করতে পারেন না—আগেই জেনে নিন।
আবর্জনার নিয়ম: জাপানে ময়লা ফেলার সঠিক পদ্ধতি
জাপানে আবর্জনা ফেলার নিয়ম বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে আবর্জনা আলাদা আলাদা ভাগে ফেলতে হয়: জ্বলনযোগ্য (燃えるゴミ), অজ্বলনযোগ্য (燃えないゴミ), প্লাস্টিক (プラスチック), ক্যান (缶), বোতল (ビン), পিইটি বোতল (ペットボトル) ইত্যাদি। প্রতিটি এলাকার নিয়ম আলাদা, তাই আপনার বিদেশ যাত্রার আগে ওয়ার্ড অফিস থেকে নির্দেশনা সংগ্রহ করুন। টোকিওর শিনজুকু ওয়ার্ডে যেমন শনিবার জ্বলনযোগ্য আবর্জনা ফেলার দিন, আর মঙ্গলবার প্লাস্টিক। আপনি যদি নিয়ম না মানেন, তাহলে আবর্জনা ফেলতে দেওয়া হবে না বা জরিমানাও হতে পারে।
আমি নিজে যখন জাপানে থাকতাম, প্রথম প্রথম প্লাস্টিক আর কাগজ আলাদা করতে ভুলে যেতাম। একবার আমার মেয়রের কাছ থেকে লাল স্টিকার দেওয়া হয়েছিল—আমার আবর্জনার ব্যাগ ফেলে দেওয়া হয়নি। তারপর থেকে আমি নিয়ম মেনে চলি। তাই নতুন শিক্ষার্থীদের বলব, প্রথম দিনেই ওয়ার্ড অফিস থেকে গার্বেজ গাইড নিয়ে নিন।
আবর্জনা ফেলার মূল নিয়ম:
- প্রতিটি আইটেম আলাদা ব্যাগে ফেলুন।
- নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট আবর্জনা ফেলুন।
- আবর্জনা ফেলার জায়গা সাধারণত নির্ধারিত থাকে—সকাল ৮টার আগে ফেলবেন না।
- বড় আবর্জনা (যেমন ফার্নিচার) ফেলতে বিশেষ টিকিট কিনতে হয়।
ট্রেনের শিষ্টাচার: ভিড়েও শান্ত থাকুন
জাপানের ট্রেনে শিষ্টাচার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মোবাইল ফোন বন্ধ বা সাইলেন্ট মোডে রাখতে হবে। ট্রেনের ভেতরে ফোনে কথা বলা বারণ, বিশেষ করে পিক আওয়ারে। আপনি যদি কথা বলতেই চান, তবে দরজার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলুন। দ্বিতীয়ত, সিটে বসার নিয়ম রয়েছে—বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত সিটে বসবেন না। আর সিটে বসলে ব্যাগ কোলে রাখুন, পাশের সিট দখল করবেন না। তৃতীয়ত, লাইন ধরে দাঁড়ানো—ট্রেনের দরজার দুই পাশে দুটি লাইন তৈরি হয়, আপনি যেন মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রীদের নামতে বাধা না দেন। টোকিওর ইয়ামানোতে লাইনে যেমন শিনাগাওয়া থেকে শিবুয়া পর্যন্ত, পিক আওয়ারে ভিড় থাকে, কিন্তু সবাই নিয়ম মেনে চলে।
আমাদের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা প্রথম দিকে ট্রেনে ফোনে কথা বলে ফেলে। আমি সবসময় বলি, জাপানে ট্রেনে ফোনে কথা বলা অসভ্যতা হিসেবে ধরা হয়। তাই অভ্যাস করুন। আর জেএলপিটি পরীক্ষার জন্য ট্রেনে যাতায়াতের সময় এই নিয়মগুলো মেনে চললে ভালো লাগবে।
কেন জাপান বেছে নেবেন?
এই নিয়মগুলো মানা কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলোই জাপানকে এত সুন্দর ও নিরাপদ দেশ বানিয়েছে। জাপানে অপরাধের হার খুব কম, আপনি রাত ১টায় বাসায় ফিরলেও ভয় নেই। প্রযুক্তি এত উন্নত যে আপনি ট্রেনের সময়সূচি মিনিটে মিনিটে জানতে পারেন। আর প্রকৃতি—মাউন্ট ফুজি, কিয়োটোর মন্দির, ওসাকার খাবার—সবকিছুই অপূর্ব। জাপানিরা কাজের ব্যাপারে এত সিরিয়াস যে তারা সময়মতো কাজ শেষ করে —এই দায়িত্ববোধ আপনি নিজেও রপ্ত করতে পারবেন।
যদি আপনি জাপানে পড়তে যেতে চান, তাহলে এই নিয়মগুলো আগে থেকে জেনে রাখুন। আর কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমি এবং আমার টিম আপনাকে গাইড করতে প্রস্তুত।
মন্তব্য
…